বাংলাদেশে পাসপোর্টের ধরন ও বৈশিষ্ট্য :
বাংলাদেশ সরকার তার নাগরিকদের আন্তর্জাতিক ভ্রমণের সুবিধার্থে তিন ধরণের পাসপোর্ট সরবরাহ করে। প্রতিটি পাসপোর্টের রঙ, ধরন ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে নির্দিষ্টতা রয়েছে। নিচে প্রতিটি পাসপোর্টের বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হলো:
- লাল রঙের পাসপোর্ট: এটি কূটনৈতিক (Diplomatic) পাসপোর্ট নামে পরিচিত, যা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিদের দেওয়া হয়, যেমন রাষ্ট্রদূত, মন্ত্রী পর্যায়ের কর্মকর্তা ইত্যাদি।
- নীল রঙের পাসপোর্ট: দাপ্তরিক (Official) কাজে ব্যবহৃত হয়। এটি সরকারি কর্মকর্তারা সরকারি কাজে বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে ব্যবহার করেন।
- সবুজ রঙের পাসপোর্ট: এই সাধারণ (Ordinary) পাসপোর্টই অধিকাংশ নাগরিকদের জন্য প্রযোজ্য এবং সাধারণ জনগণের ভ্রমণের জন্য ইস্যু করা হয়।
বিশ্ব র্যাঙ্কিং: ২০২৫ সালের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশি পাসপোর্টের অবস্থান বিশ্বের মধ্যে ১১৯তম। যদিও র্যাঙ্কিং তুলনামূলকভাবে নিচে, তবুও বৈধভাবে ভিসা নিয়ে বহু দেশে ভ্রমণ সম্ভব।
পাসপোর্টের মেয়াদ ও সংস্করণ: কত বছরের জন্য কোন অপশন?
বর্তমানে বাংলাদেশ সরকার দুই মেয়াদের পাসপোর্ট ইস্যু করে:
- ৫ বছর মেয়াদী পাসপোর্ট
- ১০ বছর মেয়াদী পাসপোর্ট
উভয় ধরণের মেয়াদের জন্য দুটি সংস্করণ পাওয়া যায়:
- ৪৮ পৃষ্ঠার পাসপোর্ট – যারা কম ভ্রমণ করেন তাদের জন্য উপযোগী
- ৬৪ পৃষ্ঠার পাসপোর্ট – যারা ঘন ঘন বিদেশ যান, তাদের জন্য উপযোগী
কত দ্রুত পাসপোর্ট পাবেন? — তিন ধরনের সার্ভিস টাইমলাইন
আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী পাসপোর্ট দ্রুততা অনুযায়ী তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে:
ধরণ | ডেলিভারি সময় |
---|---|
সাধারণ | ২১ কার্যদিবস |
জরুরী | ১০ কার্যদিবস |
অতি জরুরী | মাত্র ২ কার্যদিবস |
এই সময়সীমা কেবল আনুমানিক। বিশেষ পরিস্থিতিতে বিলম্ব হতে পারে যেমন অফিস বন্ধ, ছুটি, বা নথিপত্রের ঘাটতি।
১০ বছর মেয়াদী পাসপোর্টের ফি – হালনাগাদ (২০২৫)
🔹 ৪৮ পৃষ্ঠার পাসপোর্ট ফি:
- সাধারণ প্রসেসিং: ৫,৭৫০ টাকা
- জরুরী প্রসেসিং: ৮,০৫০ টাকা
- অতি জরুরী প্রসেসিং: ১০,৩৫০ টাকা
🔹 ৬৪ পৃষ্ঠার পাসপোর্ট ফি:
- সাধারণ প্রসেসিং: ৮,০৫০ টাকা
- জরুরী প্রসেসিং: ১০,৩৫০ টাকা
- অতি জরুরী প্রসেসিং: ১৩,৮০০ টাকা
৫ বছর মেয়াদী পাসপোর্টের খরচ – বিস্তারিত
🔹 ৪৮ পৃষ্ঠার পাসপোর্ট ফি:
- সাধারণ: ৪,০২৫ টাকা
- জরুরী: ৬,৩২৫ টাকা
- অতি জরুরী: ৮,৬২৫ টাকা
🔹 ৬৪ পৃষ্ঠার পাসপোর্ট ফি:
- সাধারণ: ৬,৩২৫ টাকা
- জরুরী: ৮,৬২৫ টাকা
- অতি জরুরী: ১২,০৭৫ টাকা
কীভাবে অনলাইনে পাসপোর্ট আবেদন করবেন – ধাপে ধাপে গাইড
বাংলাদেশে এখন পাসপোর্ট আবেদন করা আগের চেয়ে অনেক সহজ ও ডিজিটাল। চলুন দেখে নেওয়া যাক পুরো আবেদন প্রক্রিয়াটি:
১. অনলাইন ফর্ম পূরণ করুন
প্রথম ধাপে আপনাকে www.passport.gov.bd ওয়েবসাইটে গিয়ে অনলাইন আবেদন ফর্ম পূরণ করতে হবে। আবেদনকারীকে ব্যক্তিগত তথ্য, যোগাযোগের ঠিকানা, পেশা, এবং পূর্ববর্তী পাসপোর্ট (যদি থাকে) সংক্রান্ত তথ্য দিতে হবে।
২. প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট স্ক্যান করে আপলোড করুন
ফর্ম পূরণ শেষে নিম্নলিখিত নথিগুলোর স্ক্যান কপি আপনাকে আপলোড করতে হবে:
- জাতীয় পরিচয়পত্র অথবা জন্ম নিবন্ধন সনদ
- শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রমাণ (যদি প্রযোজ্য)
- সদ্য তোলা পাসপোর্ট সাইজের ছবি (সাদা ব্যাকগ্রাউন্ডে)
- বিবাহিত হলে, বিবাহ সনদ বা স্বামী/স্ত্রীর তথ্য
- পূর্ববর্তী পাসপোর্টের কপি (পুনঃনবায়নের ক্ষেত্রে)
৩. আবেদন ফি পরিশোধ করুন
নির্ধারিত ফি আপনি নিচের মাধ্যমে পরিশোধ করতে পারেন:
- সরকারি ব্যাংকের নির্দিষ্ট শাখায় চালান ফর্ম পূরণ করে
- মোবাইল ব্যাংকিং অপশন: বিকাশ, নগদ, রকেট – সহজেই ব্যবহারযোগ্য
ফি পরিশোধ শেষে রিসিটটি অবশ্যই সংরক্ষণ করুন, এটি ভবিষ্যতে প্রয়োজন হতে পারে।
৪. বায়োমেট্রিক ও সাক্ষর গ্রহণ
ফর্ম জমা দেওয়ার পর আপনার নির্ধারিত পাসপোর্ট অফিসে গিয়ে বায়োমেট্রিক তথ্য (আঙুলের ছাপ ও ছবি) দিতে হবে। এখানেই আপনার স্বাক্ষর গ্রহণ করা হবে।
৫. যাচাই-বাছাই ও ডেলিভারি
আপনার তথ্য যাচাই-বাছাই শেষে সংশ্লিষ্ট দপ্তর পাসপোর্ট তৈরি করে। এরপর নির্ধারিত সময় অনুযায়ী তা আপনাকে সরবরাহ করা হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে পাসপোর্ট সংগ্রহ করতে অফিসে যেতে হয়, তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে ডাকযোগেও পাঠানো হয়।
গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা ও সতর্কতা
- মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নবায়নের জন্য আবেদন করুন। মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আবেদন করলে অতিরিক্ত সময় ও ফি লাগতে পারে।
- সব তথ্য সঠিকভাবে পূরণ করুন। ভুল তথ্য দিলে আবেদন বাতিল বা আইনি জটিলতা হতে পারে।
- হারানো পাসপোর্টের ক্ষেত্রে থানায় জিডি করতে হবে, এবং অতিরিক্ত ফি ও ডকুমেন্ট যুক্ত করতে হবে।
- যারা প্রবাসে অবস্থান করছেন, তারা সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশ দূতাবাস/হাইকমিশনের মাধ্যমে আবেদন করতে পারবেন।
কারা কোন পাসপোর্ট বেছে নেবেন?
আপনার পরিচিতি | প্রস্তাবিত পাসপোর্ট |
---|---|
প্রবাসে নিয়মিত যাতায়াত করেন | ১০ বছর মেয়াদ, ৬৪ পৃষ্ঠা |
ছাত্র, প্রথমবার পাসপোর্ট করছেন | ৫ বছর মেয়াদ, ৪৮ পৃষ্ঠা |
ব্যবসায়ী, ভ্রমণ বেশি করেন | ১০ বছর মেয়াদ, ৬৪ পৃষ্ঠা |
এককালীন প্রয়োজনে ভ্রমণ | ৫ বছর মেয়াদ, ৪৮ পৃষ্ঠা |
অনলাইন পোর্টাল ও অফিসিয়াল রিসোর্স
আপনার আবেদন সংক্রান্ত যেকোনো তথ্য, ফি, ফর্ম এবং হালনাগাদ নির্দেশনার জন্য নিচের ওয়েবসাইটগুলো ভিজিট করুন:
অতিরিক্ত সেবা – যারা ব্যস্ত, তাদের জন্য
বর্তমানে কিছু নির্ধারিত পাসপোর্ট অফিসে অনলাইন অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়ার সুবিধা রয়েছে, যাতে লাইনে না দাঁড়িয়ে নির্দিষ্ট সময়ে বায়োমেট্রিক দিতে পারেন। পাশাপাশি নির্ধারিত জায়গায় হোম ডেলিভারি সার্ভিস চালু হয়েছে পরীক্ষামূলকভাবে।
সারাংশ: কী জানতে পারলেন এই লেখায়?
এই প্রবন্ধে আপনি বিস্তারিতভাবে জানতে পারলেন:
- বাংলাদেশে তিন প্রকার পাসপোর্টের ধরন ও রঙ
- ৫ ও ১০ বছর মেয়াদী পাসপোর্টের খরচ এবং ফি তালিকা
- সাধারণ, জরুরি ও অতি জরুরি সার্ভিস টাইমলাইন
- ধাপে ধাপে পাসপোর্ট আবেদন পদ্ধতি
- গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা ও সচেতনতা
শেষ কথা : আজই আবেদন করুন, ঝামেলামুক্ত থাকুন
পাসপোর্ট প্রক্রিয়া আজকাল অনেক সহজ এবং নাগরিক-বান্ধব। যদি আপনি এখনও আবেদন না করে থাকেন, তাহলে আর দেরি না করে প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট প্রস্তুত করে আজই আবেদন করুন। মনে রাখবেন, একটি বৈধ ও আপডেটেড পাসপোর্ট শুধু আপনার ভ্রমণের সুযোগ নয়, বরং আন্তর্জাতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ দলিল