আরব উপদ্বীপের দক্ষিণ-পূর্বের মুক্তোর মতো উজ্জ্বল দেশ ওমান, তার মরুভূমি ও সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ কর্মসংস্থান, পড়াশোনা বা ভ্রমণের উদ্দেশ্যে এই দেশে পাড়ি জমান। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ওমান ভিসার দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেকের মধ্যেই খরচ নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
২০২৫ সালে ওমান ভিসার বাজারে পরিবর্তন এসেছে, সরকারি ও বেসরকারি চ্যানেলের ভিন্ন ভিন্ন খরচ, ভিসার ধরণ অনুযায়ী ফি ও প্রক্রিয়া সব মিলিয়ে সঠিক তথ্য জানা এখন অপরিহার্য। তাই এখানে আমরা তুলে ধরছি—ওমান ভিসার ধরণ, ২০২৫ সালের খরচের হিসাব, আবেদন প্রক্রিয়া, প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও নিরাপদ ভ্রমণ টিপস।
ওমান: মরুভূমি ও আধুনিকতার মেলবন্ধন
ওমানের প্রায় ৮০% ভূখণ্ড মরুভূমি দ্বারা আচ্ছাদিত হলেও এর ভৌগোলিক বৈচিত্র্য মুগ্ধ করার মতো। রাজধানী মাস্কাট থেকে শুরু করে সালালাহর সবুজ শ্যামল প্রকৃতি পর্যন্ত, প্রতিটি অঞ্চলই ভিন্ন স্বাদের অভিজ্ঞতা দেয়।
এখানে কর্মসংস্থানের সুযোগও বহুমুখী—তেল-গ্যাস খাত থেকে শুরু করে নির্মাণ, সেবা ও পর্যটন শিল্পে নিয়মিত নতুন নিয়োগ হয়ে থাকে। তাই বাংলাদেশি শ্রমিক, শিক্ষার্থী ও পর্যটকদের জন্য এই দেশটি এক বিশেষ গন্তব্য।
ওমান ভিসার প্রধান ধরণসমূহ
ওমানে যাওয়ার উদ্দেশ্য অনুযায়ী ভিসার ধরন নির্ধারিত হয়। নিচে ২০২৫ সালের প্রেক্ষাপটে প্রতিটি ধরণের বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
১. ওয়ার্ক ভিসা
- উদ্দেশ্য: পূর্ণকালীন চাকরি
- যোগ্যতা: ওমানি কোম্পানির নিয়োগপত্র থাকা আবশ্যক
- মেয়াদ: সাধারণত ২ বছর (নবায়নযোগ্য)
- প্রক্রিয়া: নিয়োগদাতা স্পন্সর করে ইস্যু করে
- বেতন: কাজের ধরন ও অভিজ্ঞতার উপর নির্ভরশীল, মাসে ১০০–৪০০ ওমানি রিয়াল পর্যন্ত হতে পারে
২. স্টুডেন্ট ভিসা
- উদ্দেশ্য: ওমানে শিক্ষা গ্রহণ
- যোগ্যতা: স্বীকৃত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়া
- প্রয়োজনীয় নথি: ভর্তি অনুমোদনপত্র
- মেয়াদ: কোর্সের সময়সীমা অনুযায়ী
- বিশেষ নোট: কিছু বিশ্ববিদ্যালয় বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য স্কলারশিপও প্রদান করে
৩. ভিজিট ভিসা
- উদ্দেশ্য: পরিবার/বন্ধুদের দেখা বা পর্যটন
- মেয়াদ: সাধারণত ১ মাস (নবায়নযোগ্য)
- ধরন: পারিবারিক ও ব্যবসায়িক ভিজিট ভিসা
- খরচ: ৫০,০০০–১,০০,০০০ টাকা (যাতায়াতসহ)
৪. ইনভেস্টর ভিসা
- উদ্দেশ্য: ব্যবসা শুরু বা বিনিয়োগ
- যোগ্যতা: নির্দিষ্ট মূলধন বিনিয়োগের সামর্থ্য
- সুবিধা: ব্যবসা ও বসবাসের সুযোগ
- খরচ: বিনিয়োগের পরিমাণ ও প্রক্রিয়া অনুযায়ী পরিবর্তনশীল
৫. ফ্রি ভিসা
- বাস্তবতা: ওমান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এই ধরনের ভিসা দেয় না
- ঝুঁকি: জরিমানা, ডিপোর্টেশন, আইনি জটিলতা
- খরচ: ৩.৫–৫ লাখ টাকা
- কারণ: সাধারণত অন্য কোম্পানিতে অনানুষ্ঠানিকভাবে কাজ করার জন্য ব্যবহৃত হয়
৬. ফ্যামিলি ভিসা
- উদ্দেশ্য: পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আসা
- শর্ত: স্পন্সরের নির্দিষ্ট আয় থাকা জরুরি
- মেয়াদ: মূল ওয়ার্ক ভিসার সমান
- খরচ: আবেদনকারী ও স্পন্সরের অবস্থান অনুযায়ী পরিবর্তিত
ওমান ভিসার দাম ২০২৫: সরকারি ও বেসরকারি চ্যানেল
২০২৫ সালে ভিসার খরচ মূলত দুইভাবে নির্ধারিত হচ্ছে—সরকারিভাবে এবং বেসরকারিভাবে।
১. সরকারিভাবে ভিসার খরচ
- সুবিধা: নিরাপদ, স্বচ্ছ, কম খরচে
- খরচের পরিসর: ১,০০,০০০–৩,০০,০০০ টাকা
- কারণ: সরকারি চ্যানেলে দালালি ফি নেই, সরাসরি নিয়োগদাতার মাধ্যমে প্রক্রিয়া
২. বেসরকারিভাবে ভিসার খরচ
- সুবিধা: দ্রুত প্রক্রিয়া (সবসময় নয়)
- খরচের পরিসর: ৩.৫–৫ লাখ টাকা
- কারণ: এজেন্সি বা দালালের অতিরিক্ত ফি, অনানুষ্ঠানিক চুক্তি
২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে ওমানে কাজের গড় বেতন
কাজের ধরন | বেতন (ওমানি রিয়াল) | বাংলাদেশি টাকায় আনুমানিক |
---|---|---|
বাগানের কাজ | 100–120 | 28,000–33,600 |
ওয়েটার | 100–150 | 28,000–42,000 |
সুপার মার্কেট | 120–150 | 33,600–42,000 |
শেফ | 200–250 | 56,000–70,000 |
ইলেকট্রিশিয়ান | 280–360 | 78,400–100,800 |
রাজমিস্ত্রী | 300–400 | 84,000–112,000 |
ওমান ভিসা আবেদনের জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র
১. পাসপোর্ট: কমপক্ষে ৬ মাস মেয়াদ থাকা আবশ্যক
২. পাসপোর্ট সাইজ ছবি: সাম্প্রতিক, রঙিন ও স্পষ্ট
৩. জাতীয় পরিচয়পত্র/জন্ম নিবন্ধন: নিজের ও বাবা-মায়ের
৪. ভিসা আবেদন ফরম: পূর্ণাঙ্গভাবে পূরণকৃত
5. পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট: অপরাধমুক্ত থাকার প্রমাণ
6. ব্যাংক স্টেটমেন্ট: শেষ ৬ মাসের
7. ভ্যাকসিন সনদপত্র: কোভিড-১৯ টিকা সম্পন্ন প্রমাণ
ওমান ভ্রমণ ও কাজের জন্য নিরাপদ টিপস
- সবসময় সরকারিভাবে ভিসা প্রক্রিয়া বেছে নিন
- চুক্তিপত্র ভালোভাবে পড়ে সই করুন
- সন্দেহজনক দালাল বা অতিরিক্ত ফি দাবি করা এজেন্সি এড়িয়ে চলুন
- প্রয়োজনীয় নথিপত্রের একাধিক কপি রাখুন
- জরুরি যোগাযোগ নম্বর হাতের কাছে রাখুন
শেষ কথা
ওমান ভিসার দাম নিয়ে সঠিক ও হালনাগাদ তথ্য জানা প্রতিটি ভ্রমণকারী বা কর্মসংস্থানের সন্ধানকারীর জন্য অপরিহার্য। ভিসার ধরন, আবেদন পদ্ধতি, খরচ এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকলে অপ্রয়োজনীয় সময়, অর্থ ও ঝুঁকি—সবই কমানো যায়।
সরকারি চ্যানেল সাধারণত নিরাপদ, স্বচ্ছ এবং খরচের দিক থেকে সাশ্রয়ী। অন্যদিকে, বেসরকারি বা দালালি পথে খরচ অনেক বেশি হলেও অনেকেই তাড়াহুড়োতে সেই পথ বেছে নেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে—আইনসঙ্গত প্রক্রিয়া অনুসরণ করলে শুধু ভিসা পাওয়া সহজ হয় না, বরং ওমানে অবস্থানকালে নিরাপত্তা ও অধিকারও নিশ্চিত হয়।
তাই, ওমান যাত্রার আগে ভিসার ধরন ঠিকভাবে বেছে নিন, প্রয়োজনীয় নথি প্রস্তুত করুন, আর সবসময় বিশ্বাসযোগ্য ও অনুমোদিত সংস্থার মাধ্যমে প্রক্রিয়া সম্পন্ন করুন। নিরাপদ ভ্রমণই হবে সফল ভ্রমণের প্রথম ধাপ।